এআই দিয়ে ৬৪ জেলার অ্যাপ বানিয়ে যেভাবে ভাইরাল হলেন সাব্বির

নিজস্ব প্রতিবেদক

বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, রাত ০৯:২২


বাংলাদেশের ৬৪ জেলার কোন কোনটিতে ঘুরেছেন, এক ক্লিকেই তা দেখা যায় মানচিত্রে। নিজের নাম দিয়ে সেই মানচিত্র ডাউনলোডও করা যায়। আবার চার-পাঁচটি জেলা নির্বাচন করলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সাজিয়ে দিতে পারে পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনা—কোথায় আগে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে যাবেন, সম্ভাব্য খরচ কত হবে, এসবও জানা যাবে। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ২৪০টির বেশি দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে রয়েছে তথ্য। আছে বিশ্ব মানচিত্র, কুইজ ও ইন্টারেকটিভ গেমও।

এমন একটি ওয়েব অ্যাপ তৈরি করে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন মো. সাব্বির হোসেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। বর্তমানে সফটওয়্যার ডিজাইনের কাজ করেন সাব্বির।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মোবাইল অ্যাপ ও সফটওয়্যার ডিজাইনের সঙ্গে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন সাব্বির। নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভাবনাটিকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন তিনি। শুরুতে ওয়েব অ্যাপটি ছিল একান্তই নিজের ব্যবহারের জন্য। পরে গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম ম্যাপ ফিচারটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।

সাব্বিরের তৈরি ‘আনসিন বাংলাদেশ’ ওয়েব অ্যাপটির শুরু হয়েছিল তাঁর নিজের প্রয়োজন থেকে। ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন সাব্বির। নিজের কৌতূহল থেকে প্রথমে এআই ব্যবহার করে বাংলাদেশের একটি মানচিত্র তৈরি করেন তিনি। যেসব জেলা ঘুরেছেন, সেগুলো মানচিত্রে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করেন। তবে সেটি ছিল শুধু একটি মানচিত্রের ছবি। নতুন কোনো জেলা ঘুরলে আবার শুরু থেকে মানচিত্রটি পরিবর্তন করতে হতো।

সাব্বির বলেন, ‘আমি ভাবলাম, বিষয়টি যদি এমনভাবে করা যায়, ভ্রমণের জন্য কেউ নতুন কোনো জেলা বাছাই করলে সেটি আগের জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ম্যাপ তৈরি হবে। তাহলে সময় সাশ্রয় হবে। সেই ভাবনা থেকেই মূলত এই ওয়েব অ্যাপ বানানো শুরু।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মোবাইল অ্যাপ ও সফটওয়্যার ডিজাইনের সঙ্গে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন সাব্বির। নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভাবনাটিকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন তিনি। শুরুতে ওয়েব অ্যাপটি ছিল একান্তই নিজের ব্যবহারের জন্য। পরে গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম ম্যাপ ফিচারটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। প্রথম পোস্টে খুব বেশি সাড়া পাননি।

পরে মানচিত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ভাবনাটি আরও বড় হয়। বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে কাজ করার কথা ভাবেন সাব্বির। তাঁর মনে হয়, কক্সবাজার, রাঙামাটি বা বান্দরবানের মতো পরিচিত জায়গার বাইরে দেশের অনেক ছোট ও কম পরিচিত স্থান রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে অনেকেরই জানা নেই। সেগুলোও যদি এক জায়গায় পাওয়া যায়, তাহলে ভ্রমণ আরও সহজ হবে।

সেই ভাবনা থেকেই ‘কোথায় ঘুরবেন’ অপশনটি যুক্ত করেন সাব্বির। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার পরিচিত ও কম পরিচিত বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ছবি ও তথ্যসহ যুক্ত করা হয় সেখানে। কোথায় যেতে হবে, কীভাবে যেতে হবে, কোথায় থাকা যাবে, সম্ভাব্য খরচ কত, গাড়িভাড়া কত হতে পারে—এসব তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। কোথায় নেটওয়ার্ক আছে, পার্কিং বা পাবলিক টয়লেটের সুবিধা আছে কি না, সেই তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে।

এরপর যুক্ত হয় ‘ট্রিপ প্ল্যানার’। নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকেই এই সুবিধা যুক্ত করেন সাব্বির। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে অনেক সময় একসঙ্গে তিন-চারটি জেলা ঘুরি। তাই একজন ব্যবহারকারী কোন জেলায় আগে যাবেন, কোন জেলায় পরে যাবেন—এসব বিবেচনা করে একটি গোছানো ট্রিপ প্ল্যান তৈরি করার সুযোগ রাখা হয়েছে এখানে।’

এরপর ওয়েব অ্যাপে যুক্ত হয় বিশ্ব মানচিত্র, কুইজ ও ম্যাপভিত্তিক ছোট গেম। ব্যবহারকারীরা কুইজে অংশ নিয়ে স্কোরসহ ফটোকার্ড তৈরি করতে পারেন। সেটি বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করার পাশাপাশি অন্যদের খেলতেও আমন্ত্রণ জানানো যায়। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই ব্যবহার করা যাচ্ছে ওয়েব অ্যাপটি।

এসব ফিচার যুক্ত করার পর গত শনিবার দ্বিতীয়বার ফেসবুকে পোস্ট করেন সাব্বির। এরপরই পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ নিজেদের ভ্রমণ মানচিত্র তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করতে শুরু করেন।

সাব্বিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ সাত দিনে ওয়েব অ্যাপটিতে ২ কোটি ৪০ লাখ ভিজিট হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিক ভিজিটরের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮০ হাজার। ওয়েবসাইটের লাইভ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ ১৬ হাজার ৮০৩ জন বাংলাদেশের মানচিত্র এবং ৪৫ হাজার ৫৩৮ জন বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেছেন। এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

সাব্বিরের এই কাজের পেছনে কোনো বড় দল নেই। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত একাই ওয়েব অ্যাপটি তৈরি করছেন তিনি। কোড তৈরিতে ব্যবহার করেছেন এআই টুল ‘ক্লড কোড’। ভাইরাল হওয়ার পরও ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন প্রচারে খুব একটা আগ্রহ নেই সাব্বিরের। বর্তমানে ভ্রমণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গো-জায়ানের সঙ্গে একটি ব্র্যান্ড কলাবোরেশন হয়েছে। ট্রিপ প্ল্যানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সেবার সংযোগ রাখা হয়েছে।

সাব্বির বলেন, এই ওয়েব অ্যাপ তাঁর আয়ের প্রধান উৎস নয়। সফটওয়্যার ডিজাইনার হিসেবে তিনি কাজ করেন। লিথুয়ানিয়ার প্রতিষ্ঠান ব্রেভনের সঙ্গে পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব এজেন্সি ‘ডিজাইন মিঙ্গেল’ রয়েছে। এসব কাজের কারণে ওয়েব অ্যাপটি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে ও বিজ্ঞাপন ছাড়াই চালু রাখতে চান তিনি।

সামনে ‘আনসিন বাংলাদেশ’-এ আরও কিছু সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সাব্বিরের। এর মধ্যে ‘ট্রাভেল পার্সোনালিটি’ নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ব্যবহারকারীর ভ্রমণের অভ্যাস ও পছন্দের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে একটি ট্রাভেল পার্সোনালিটি কার্ড। থাকবে বিভিন্ন অর্জনের ব্যাজও। কেউ ৬৪ জেলা ভ্রমণ করলে পাবেন বিশেষ ব্যাজ। আবার কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের বেশি জেলা ভ্রমণ করলেও মিলবে আলাদা স্বীকৃতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় খেলাধুলার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন সাব্বির। বিভাগীয় ক্রিকেট দলের মূল একাদশে ফাস্ট বোলার হিসেবে খেলেছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। তবে পরিবারের সঙ্গে থাকেন চট্টগ্রাম নগরে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই আইটি খাতে কাজ শুরু করেন সাব্বির। তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় ২০২০ সালের দিকে তাঁর এ যাত্রা শুরু হয়। ২০২২ সালের শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানে বাসা থেকে কাজের সুযোগ পান তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যারিয়ারও এগিয়ে নিতে থাকেন। বিভাগের পড়াশোনার বাইরে অর্জিত প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েই গড়ে তোলেন নিজের ক্যারিয়ার।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাব্বির বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট আমার তেমন কাজে লাগছে না। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন দক্ষতা শেখা জরুরি। শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে এআই ও অটোমেশন কাজে লাগিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান করা এবং সেই দক্ষতা দিয়ে আয় করার চেষ্টা করা উচিত।’

তরুণদের উদ্দেশে সাব্বির বলেন, ‘এআইকে শুধু ছবি তৈরি বা লেখালেখির টুল হিসেবে না দেখে কাজের দক্ষতা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। শুধু টিউশনের পেছনে না ছুটে দক্ষতা অর্জন করে সেই দক্ষতা কাজে লাগানো উচিত। এতে আয় করার পাশাপাশি নিজের কাজের একটি ভালো পরিচয় তৈরি করা যায়।’

এমএসি/আরএইচ

Link copied