দলীয় স্বার্থে বাধাগ্রস্ত রাষ্ট্র সংস্কার, দায় সরকার ও বিরোধী দলের: টিআইবি
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:১৪
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ ক্ষমতার রাজনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের মুখে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দেয়া এক বিবৃতিতে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
সংস্থাটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেয়া সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষার পরিবর্তে বর্তমান সরকার নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্র সংস্কারে কার্যকর ভূমিকা রাখার পরিবর্তে বিরোধী দলও দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পর রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্র জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে যথাযথ শিক্ষা নিতে পারেনি। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও রাষ্ট্রের আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে।
টিআইবির বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে জয়ী দলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ায় সংস্কার কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সংবিধান সংশোধন ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের উদ্যোগ ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইন নিয়েও সমালোচনা করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার জন-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে যে আইন করা হয়েছে, তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী সংস্থাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া র্যাব বিলুপ্ত করার পরিবর্তে নতুন নামে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতাশালী করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এসব উদ্যোগ তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে মনে করছে টিআইবি। বিবৃতিতে বলা হয়, এ কমিশন গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। একইভাবে, দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ এবং তা নিয়মিত হালনাগাদ করার বিধান নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য হয়েছিল। তবে বর্তমান সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দুদক ও মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের পরিণতি ভোগ করার পরও রাজনৈতিক দলগুলো এত অল্প সময়ের মধ্যে সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে ভুলে গেল, তা প্রশ্নের জন্ম দেয়। জুলাই জাতীয় সনদ অতীতের অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা থেকে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চার প্রবণতা সেই ঐকমত্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী জোট উভয়কেই দায়ী করেছে টিআইবি। সংস্থাটির অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের একাংশের মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’ ধরনের মনোভাব থেকে দখল, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটও জনস্বার্থে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ এগিয়ে নেয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের তৎপরতায় ব্যস্ত রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
টিআইবির মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিবর্তন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধের লক্ষ্যেই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নজিরবিহীন ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। সেই ঐকমত্যকে কার্যকর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একই ধরনের সদিচ্ছা, দায়িত্বশীলতা ও অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন। অন্যথায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা এবং জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে।
এমএসি/আরএইচ