বিশ্বের শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ৪৫তম

নিজস্ব প্রতিবেদক

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, রাত ০৮:৫৪


জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট-ঘাটতির প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের বোঝা ও সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়তে থাকায় চাপে পড়ছে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি। সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৪০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশের সরকার আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।

সরকারি ঋণে শীর্ষ পাঁচ দেশ

আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৯৯ শতাংশ, যা বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

যুক্তরাজ্য রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০২ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১১৮ শতাংশ।

এ ছাড়া ইতালির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ। আর ভারত রয়েছে সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে সপ্তম অবস্থানে। দেশটির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৮৩ শতাংশ।

দেড় দশকে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ

বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ ২০১০ সালে ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ গত দেড় দশকে দেশের সরকারি ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। তবে ঋণ-জিডিপি অনুপাতের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি বড় অর্থনীতির তুলনায় এখনো নিচে রয়েছে বাংলাদেশ।

কীভাবে ঋণ নেয় সরকার

সরকার সাধারণত সরকারি বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহ করে। বিনিয়োগকারীরা সরকারকে অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে সুদ পান। পাশাপাশি নির্ধারিত মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যেমন, ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের অর্থ সাধারণত ১০ বছর পর পরিশোধ করা হয়।

বন্ডের দাম কমলে সাধারণত এর ইল্ড বা মুনাফার হার বেড়ে যায়। এতে সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হয়। ফলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়ে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমে যেতে পারে।

ফ্রান্সে ঋণের সুদ নিয়ে উদ্বেগ

ইউরোপের চলমান অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকারি অর্থব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য ফ্রান্সকে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ইতালি ও গ্রিসের তুলনায়ও ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার ব্যয় বেশি।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়।

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট এবং সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ ঘিরে অসন্তোষ বাড়ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

বৈশ্বিক ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে মোট ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মাথাপিছু হিসাবে বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।

এই ব্যয় বিশ্বের সামরিক খাতে ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের চেয়েও বেশি।

ঋণের চাপ পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ওপর

সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে জনসেবামূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমে যায়। বাড়তি সুদের ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো কিংবা অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

এ ছাড়া সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বন্ধকি ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়তে পারে।

বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ার ফলে সরকারগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ঋণের দায় সামলানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা।

এমএসি/আরএইচ

Link copied