তিন দিনেও মেলেনি বাঘের সন্ধান, ঘুম নেই স্থানীয়দের

নিজস্ব প্রতিবেদক

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, রাত ০৩:০২


লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় সীমান্ত পেরিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্য চিতা বাঘটির সন্ধান তিন দিনেও মেলেনি। বাঘটি ভারতে ফিরে যেতে না পেরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই অবস্থান করছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। এতে পুরো সীমান্ত এলাকায় বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি ও আতঙ্ক।

বাঘটি সর্বশেষ যেখানে দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে প্রায় এক থেকে চার কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ঘন শালবন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ড্রোনের নজরদারি ও মানুষের ভিড় এড়িয়ে বাঘটি শালবনের ভেতরে কিংবা আশপাশের ঝোপঝাড়ে আত্মগোপন করে থাকতে পারে।

এদিকে বাঘের আতঙ্কে হাতীবান্ধার হাজারো মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় বাঘ দেখার নতুন নতুন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে লাঠিসোঁটা ও টর্চলাইট হাতে দলবদ্ধভাবে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন গ্রামবাসীরা।

সীমান্ত এলাকার একাধিক বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বাঘটি বাংলাদেশে ঢোকার পর বিজিবি ও স্থানীয়দের তৎপরতার কারণে সীমান্ত ঘেঁষা জঙ্গল বা কাঁটাতারের দিকে পুনরায় পেরিয়ে যেতে পারেনি। যে আমঝোল সীমান্ত ও সিঙ্গিমারি এলাকায় বাঘটি শেষবারের মতো দেখা গিয়ে নিখোঁজ হয়, সেখান থেকে হাঁটা দূরত্বেই ৪ কিলোমিটার শালবন এলাকা। স্থানীয় মানুষের ধারণা, দিনের আলোতে কৌতূহলী জনতার শোরগোল থেকে আত্মরক্ষা করতে বাঘটি শালবনের ভেতরে বা পাশের ঘন ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে পড়েছে। এছাড়াও রাতের অন্ধকারে খাবার বা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হচ্ছে।

সিঙ্গিমারি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা সোলায়মান আলী (৫৫) বলেন, "বাঘটা কিন্তু ভারতে ফেরত যাইতে পারে নাই। ওপারে কাঁটাতার আর এপারে মানুষের হইচই দেইখা ভয় পাইয়া সীমান্ত পার হইতে না পাইরা কাছেই থাকা শালবনে ঢুকে গেছে। নিখোঁজ হওয়া জায়গা থাইকা শালবন তো একদম কাছে, মাত্র ৪ কিলোমিটারের মতো দূরত্ব। ওখানেই ওটা ওত পাইতা আছে। আমরা দিনের বেলাতেও একা বের হইতে পারতেছি না, রাতে তো দূরে থাক।

আমঝোল গ্রামের যুবক আলামিন হোসেন (৩২) জানান, রোববার রাতে ড্রোনে যেটা দেখা গিয়েছিল, সেটা তো চিতা বাঘ। ভারতের দিকে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাঘটা যেখানে শেষ দেখা গেল, সেখান থেকে হাত বাড়ালেই শালবন। আমাদের ধারণা, গহীন শালবনের ভেতর কিংবা ঘন ঝোপের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। তাই রাতে আমরা কেউ ঘুমাতে পারছি না।

বাঘ লোকালয়ে ঢুকে শিশু কিংবা গবাদিপশুর ক্ষতি করতে পারে এমন চরম আশঙ্কায় হাতীবান্ধার বেশ কয়েকটি গ্রামের যুবকরা দলবদ্ধ হয়ে লাঠিসোঁটা, বাঁশের কঞ্চি ও টর্চলাইট হাতে রাতভর পাহারা দিচ্ছেন। সন্ধ্যার পর থেকেই শুনশান নীরবতা নেমে আসছে গ্রামগুলোতে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। মসজিদ থেকেও বাঘের উপস্থিতি নিয়ে সতর্কতামূলক মাইকিং করা হয়েছে।

হাতীবান্ধার গোতামারী এলাকার দিনমজুর ও গ্রামবাসী মজিবর রহমান (৪৫) বলেন, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাতে দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারছি না। কখন শালবন থেকে বের হয়ে এসে কার ওপর হামলা করে বলা তো যায় না! গ্রামের জোয়ান ছেলেরা দল বেঁধে সারা রাত টর্চ মারতে মারতে পাহারা দিচ্ছে। কোন দিকে একটু পাতাও নড়লে আমরা চমকে উঠছি।

একই এলাকার গৃহিণী রাশেদা বেগম (৩৮) বলেন, রোববার যে তিনজন হাসপাতালে গেল, তারপর থেকে চরম আতঙ্কে আছি। ছাগল-গরু গোয়ালে রেখে দরজায় শক্ত করে তালা দিয়ে রাখি। রাতে ঘরের বাতি নেভাতে ভয় লাগে।

এদিকে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ও মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সিঙ্গিমারি এলাকায় বাঘ দেখার নতুন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। শালবনের এত কাছাকাছি বাঘ নিখোঁজ হওয়ায় এবং একের পর এক প্রত্যক্ষদর্শীদের নানা জল্পনা-কল্পনায় পুরো হাতীবান্ধা উপজেলাজুড়ে চরম উদ্বেগ ও থমথমে ভাব বজায় রয়েছে।

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, গতকাল রাতেও খবর ছড়ালো যে সিঙ্গিমারির শালবনের ভেতরে বা কাছেই নাকি বাঘটাকে দেখা গেছে। এলাকা থেকে শালবন বেশি দূরে না হওয়ায় এই গুঞ্জনের পর কেউ আর এক মুহূর্তের জন্য ঘুমাতে পারেনি। পুলিশ-বিজিবি টহল দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু চোখের সামনে বাঘটা না ধরা পড়া পর্যন্ত আমরা শান্ত হতে পারছি না।

গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইন বলেন, "সিঙ্গিমারিতে বাঘ দেখার খবর পাওয়ার পরপরই সেখানে বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে নিখোঁজ স্থানসংলগ্ন শালবন ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে ড্রোন ও থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয়দের সহায়তায় তল্লাশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছেন। তবে আজ সকালে তারা অভিযান বন্ধ করে তারা আবার ঢাকায় চলে গেছে।

এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে ড্রোনের সাহায্যে বাঘটির স্পষ্ট সন্ধান না মিললেও এলাকাটিতে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ এবং বন বিভাগের উদ্ধারকারী দল। তবে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চালাতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ ধান ও অন্যান্য ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাদের দাবি, কৌতূহলী জনতার ভিড় এবং ড্রোনের তল্লাশির সময় উদ্ধারকারীদের যাতায়াতে জমির পাকা ও আধা-পাকা ধান মাড়ান পড়েছে। ভুক্তভোগী কৃষকেরা এর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

লালমনিরহাট জেলা প্রসাশক মুহা: রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ওই এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদি কোন কৃষকের ক্ষতি হয়ে থাকে তাহলে তালিকা করে কৃষকের পাশে থাকার জন্য। আর বাঘের ভয় করার কোন কারণ নেই, বিজিবি’র পাশাপাশি পুলিশসহ প্রসাশনের কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে সবাইকে সর্তক থাকতে হবে। যদি কারো ধারণা হয় যে, বাঘটি বাংলাদেশের কোথাও লুকিয়ে রয়েছে, তাহলে অব্যশই সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

উল্লেখ্য, গত রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তের ৯০৫ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারসংলগ্ন এলাকায় ভারতের দিক থেকে আসা বাঘটি প্রথম হামলা চালায়। ধানক্ষেতে ছাগল আনতে গেলে আমঝোল গ্রামের শরিফা বেগম (৩৪)-এর ওপর বাঘটি ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে নজরুল ইসলাম (৪৩) ও আফসার আলী (৪০) নামে আরও দুজন বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। তারা বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর বিজিবি ফাঁকা গুলি ও মাইকিং করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই দিন মধ্যরাতে ড্রোনের ক্যামেরায় সীমান্তের কাছে বাঘটি দেখা গেলেও পরবর্তীতে ঘন কুয়াশা, গাছপালা ও কাছাকাছি শালবনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেটি নজরদারির বাইরে চলে যায়।

এমএসি/আরএইচ

Link copied