যুক্তরাজ্যে পড়তে গিয়ে বিপাকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:১৫
যুক্তরাজ্যে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন ও স্পনসর লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করছে দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
১০ অক্টোবর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হার বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আবেদন প্রত্যাহারের হার ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। নাইজেরীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তা ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
কঠোর হচ্ছে ভিসা নীতিমালা
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ইউকে ভিসাস অ্যান্ড ইমিগ্রেশন গত ১ জুন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ‘বেসিক কমপ্লায়েন্স অ্যাসেসমেন্ট’ নীতিমালায় কঠোরতা আরোপ করেছে। নতুন নিয়মে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের গ্রহণযোগ্য হার ১০ শতাংশের নিচ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশের নিচে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভিসা পাওয়া শিক্ষার্থীদের কোর্সে ভর্তি সম্পন্ন করার ন্যূনতম হার ৯০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯৫ শতাংশ করা হয়েছে।
বর্তমানে কোর্স সম্পন্ন করার ন্যূনতম হার ৮৫ শতাংশ। ২০২৭ সালের জুন থেকে তা বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ করার কথা রয়েছে। নতুন মূল্যায়নব্যবস্থায় শর্ত পূরণে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। গুরুতর বা বারবার নিয়ম ভাঙার ক্ষেত্রে স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকিও রয়েছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৪২ প্রতিষ্ঠানে বিধিনিষেধ
প্রথম আলোর পর্যালোচনায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগে কাজ করা বিভিন্ন এজেন্সির অভিজ্ঞতাভিত্তিক দুটি তালিকা থেকে অন্তত ৪২টি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাম্পাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধের তথ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে ২২টি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভর্তি বন্ধ বা সীমিত করার তথ্য রয়েছে। অন্য ২০টি প্রতিষ্ঠানে বিশেষভাবে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা নেই। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট কোর্স বা ক্যাম্পাসে বিধিনিষেধ থাকলেও অন্য ক্ষেত্রে ভর্তির সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি সীমিত বা বন্ধ রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটি, কিল ইউনিভার্সিটি, ডি মন্টফোর্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ড, কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাডফোর্ড।
অন্যদিকে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক বিধিনিষেধের তালিকায় রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার, ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন, ক্যান্টারবেরি ক্রাইস্ট চার্চ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ব্রাইটন, কার্ডিফ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ।
ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহারে বিপাকে শিক্ষার্থীরা
যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগ ও উচ্চশিক্ষাবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল অ্যাডমিশনের জ্যেষ্ঠ নিয়োগ পরামর্শক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, হোম অফিসের নতুন নিয়মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভাষাদক্ষতা ও আর্থিক সক্ষমতা আগের চেয়ে কঠোরভাবে যাচাই করছে।
নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর সেমিস্টারে ভর্তি হতে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন করার পর ইউকেভিআই থেকে সাক্ষাৎকারের ডাক পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে বিষয়টি জানানোর পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবেদন পুনর্মূল্যায়ন করে ভর্তি স্পনসর প্রত্যাহার করেছে। তাঁর দাবি, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী এ পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। সেপ্টেম্বর সেমিস্টারে বাংলাদেশ থেকে কয়েক শ শিক্ষার্থী একই ধরনের জটিলতায় পড়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
গ্লোবাল অ্যাডমিশনের সিলেট অঞ্চলের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী উপদেষ্টা মো. মাবরুর আহমেদ বলেন, ভর্তি প্রক্রিয়ায় কঠোরতার পাশাপাশি টিউশন ফি বৃদ্ধি, পাউন্ডের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং যুক্তরাজ্যে আবাসন ও ভিসার বাড়তি খরচ শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী এখন যুক্তরাজ্যের বিকল্প দেশ বেছে নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আঞ্চলিক পরিচয়ের পরিবর্তে তাঁদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।
হোম অফিসের অবস্থান
যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা দেশটির অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখেন। তবে অভিবাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
নতুন নীতিমালার কারণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কতটা সীমিত হবে, তা নির্ভর করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ভর্তি নীতি, ভিসা আবেদনকারীদের যোগ্যতা এবং নতুন নিয়ম মেনে চলার সক্ষমতার ওপর।
এমএসি/আরএইচ