লাল না সাদা, কোন ডিমে পুষ্টি বেশি?

নিজস্ব প্রতিবেদক

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:০৫


ট্রেনে কিংবা বাসে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন। হঠাৎ কানে এল হকারের হাঁক, ‘চাই ডিম! গরম ডিম।’ পেটও খালি, তাই একটা ডিম খাওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু ডিম কিনতে গিয়ে মনে প্রশ্ন জাগল, লাল ডিম নেবেন, নাকি সাদা? দেশি মুরগির ডিম ভালো, নাকি ফার্মের? আবার হাঁসের ডিমে কি সত্যিই পুষ্টি বেশি? ডিম নিয়ে এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই রয়েছে। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই খাবারের কোনটি বেছে নেবেন, তা জানতে হলে আগে কয়েকটি প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

ডিমে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিনসহ শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। তবে সব ডিমের পুষ্টিমান একেবারে সমান নয়। ডিমের আকার, মুরগি বা হাঁসের খাবার এবং উৎপাদনপদ্ধতির কারণে পুষ্টির পরিমাণে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে। তাই শুধু রং কিংবা দেশি-ফার্মের পরিচয় দেখে ডিমের পুষ্টিগুণ বিচার করা ঠিক নয়।
 
লাল না সাদা, কোন ডিমে পুষ্টি বেশি?
অনেকের ধারণা, লাল ডিমে পুষ্টি বেশি বলে এর দামও তুলনামূলক বেশি। তবে এ ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। লাল ও সাদা ডিমের পুষ্টিমান সাধারণত প্রায় একই। ডিমের খোসার রং মূলত মুরগির বংশগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। নির্দিষ্ট কিছু জাতের মুরগি সাদা ডিম দেয়, আবার অন্য কিছু জাতের মুরগি বাদামি বা লালচে খোসার ডিম দেয়।
 
অর্থাৎ, ডিমের খোসার রং দেখে পুষ্টিগুণ নির্ধারণ করা যায় না। তাই শুধু লাল ডিমে বেশি পুষ্টি পাওয়া যাবে এমন ধারণা থেকে বেশি দাম দিয়ে ডিম কেনার প্রয়োজন নেই।
 
দেশি না ফার্মের মুরগির ডিম?
দেশি মুরগির ডিমকে অনেকে বেশি পুষ্টিকর মনে করেন। কিন্তু দেশি ও ফার্মের ডিমের পুষ্টিগত পার্থক্য নির্ভর করে মুরগির খাবার, পালনপদ্ধতি এবং ডিমের আকারসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
 
দেশি মুরগি সাধারণত বাড়ির আশপাশে চরে বেড়িয়ে নানা ধরনের খাবার খায়। অন্যদিকে, খামারের মুরগিকে নির্দিষ্ট খাদ্য দেয়া হয়। খাবারের ধরন অনুযায়ী ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসহ কিছু পুষ্টি উপাদানের পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে। তবে ফার্মের ডিম মানেই ক্ষতিকর, কিংবা দেশি ডিম সব সময় বেশি পুষ্টিকর এমন সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। মুরগির খাবারে ক্ষতিকর হরমোন বা অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে কি না, তা যাচাই ছাড়া ধরে নেয়াও উচিত নয়।
 
দেশি ডিম সাধারণত আকারে ছোট এবং অনেক ক্ষেত্রে দামেও বেশি। তাই বাজেট ও সহজলভ্যতা বিবেচনায় নিরাপদ উৎস থেকে কেনা ফার্মের ডিমও ভালো পুষ্টির উৎস হতে পারে।
 
হাঁসের ডিম, নাকি মুরগির ডিম?
হাঁস ও মুরগির ডিম দুটিই পুষ্টিকর। তবে হাঁসের ডিম সাধারণত আকারে বড় হওয়ায় একটি ডিমে মোট ক্যালরি, প্রোটিন, চর্বি ও কিছু ভিটামিনের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি এবং ওমেগা-৩-এর পরিমাণ ডিমের আকার ও হাঁসের খাবারের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।
 
অনেকে মনে করেন, হাঁসের ডিম খেলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। তবে শুধু হাঁসের ডিম খাওয়ার কারণে রক্তচাপ বাড়ে এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। তবে হাঁসের ডিমে মুরগির ডিমের তুলনায় সাধারণত কোলেস্টেরলও বেশি থাকে। তাই যাঁদের হৃদ্‌রোগ বা রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা সম্পর্কে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
 
দিনে কয়টি ডিম খাওয়া যায়?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন কতটি ডিম উপযুক্ত, তা নির্ভর করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির ওপর। সবার জন্য প্রতিদিন একই সংখ্যক ডিম খাওয়ার নিয়ম নেই।
 
ডিমে প্রোটিনসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থাকলেও অতিরিক্ত খাওয়ার বদলে সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে খাওয়াই ভালো। যাঁদের হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস বা রক্তে কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য ডিমের পরিমাণ নির্ধারণে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
 
ডিমের সাদা অংশ, নাকি কুসুম?
ডিমের সাদা অংশে মূলত প্রোটিন থাকে, আর কুসুমে রয়েছে চর্বি, কোলেস্টেরল, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। তাই কুসুম বাদ দিলে ডিমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিও বাদ পড়ে যায়।
 
তবে যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের কুসুম খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সবার জন্য কুসুম পুরোপুরি বাদ দেয়ার নিয়ম নেই ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়াই ভালো।
 
ডিম বাছাইয়ের আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন-
  • খোসার রং: লাল বা সাদা—শুধু রং দেখে পুষ্টিগুণ বিচার করবেন না।
  • দেশি ও ফার্মের ডিম: নিরাপদ উৎস, মুরগির খাবার ও ডিমের আকার বিবেচনা করুন।
  • হাঁস ও মুরগির ডিম: দুটিই পুষ্টিকর; হাঁসের ডিমে আকারের কারণে মোট পুষ্টি ও কোলেস্টেরল বেশি থাকতে পারে।
  • ডিমের পরিমাণ: বয়স, খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করুন।
  • সাদা অংশ ও কুসুম: সাদা অংশে প্রোটিন বেশি, আর কুসুমেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান।
  • নিরাপত্তা: পরিষ্কার, অক্ষত খোসার ডিম কিনুন এবং খাবারের বিষক্রিয়ার ঝুঁকি কমাতে ডিম ভালোভাবে রান্না করে খান।

 

ডিমের পুষ্টিগুণ পেতে নির্দিষ্ট রং বা ধরনের ডিম খাওয়াই জরুরি নয়। বরং নিরাপদ উৎস থেকে ডিম কেনা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও রান্না করা এবং নিজের স্বাস্থ্য অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
 
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (USDA), হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং ও হার্ভার্ডের দ্য নিউট্রিশন সোর্স।

 

 

 

এমএসি/আরএইচ

Link copied